সিএসআর তহবিলের ২৭৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
বিভিন্ন ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা ও ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বৃহস্পতিবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলাটি করা হয়। দুদকের উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান।
মামলার তৃতীয় আসামি মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার নাসা গ্রুপের কর্ণধার। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক সভাপতি এবং এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে অর্থ সংগ্রহ করেন। দুদকের দাবি, এর ফলে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
৪১ ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে ৪১টি তফসিলি ব্যাংকের নথি ও তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সংস্থাটির দাবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের নির্বাহী কমিটির নিয়মিত এজেন্ডায় ছিল না।
তবে বিষয়টি ‘বিবিধ’ আলোচনার মাধ্যমে সভায় তোলা হয়। দুদকের অভিযোগ, তৎকালীন বিএবি সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার তাঁর প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিষয়টি সভায় উপস্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টের অনুকূলে মোট ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
সিএসআর নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০৮ সালের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা এবং ২০২২ সালের সামাজিক দায়বদ্ধতা নীতিমালায় সিএসআর তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দুদকের দাবি, ওই নীতিমালায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার অনুমোদন নেই।
এরপরও ব্যাংকগুলোর ওপর প্রভাব প্রয়োগ করে ট্রাস্টের অনুকূলে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ট্রাস্টের ঠিকানা পরিদর্শন করে কোনো দৃশ্যমান দাপ্তরিক কার্যক্রম পাওয়া যায়নি বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সমাজসেবা অধিদপ্তর বা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদন রয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক।
প্রতিশ্রুত কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন
দুদকের ভাষ্য, ট্রাস্টের নামে সিএসআর তহবিল সংগ্রহ করা হলেও অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে প্রতিশ্রুত কার্যক্রমের অস্তিত্ব অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির অভিযোগ, ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে ট্রাস্টকে ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয় এবং নজরুল ইসলাম মজুমদার তাঁর পদ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও নাম আসতে পারে
দুদকের অভিযোগ, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও নজরুল ইসলাম মজুমদার পারস্পরিক যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করেছেন।
এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, তদন্তে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সেটিও মামলার তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ইতি/

আপনার মতামত লিখুন